১৯৭২ সাল। সবে মাত্র বাংলাদেশের সংগ্রাম শেষ হয়েছে। আমরা লাভ করেছি স্বাধীন, সার্বভৌম একটি দেশ। সমগ্র দেশবাসীর মনে একই চেতনা; সদ্যজাত দেশটিকে সোনার বাংলায় পরিণত করতে হবে। সবার মাথায় নানা পরিকল্পনা, নিজ নিজ এলাকায় উন্নয়নই আসলে সারা দেশের উন্নয়ন। কুমিল্লা জেলার হোমনা থানাধীন আমাদের এই রামকৃষ্ণপুর এলাকাটি বলতে গেলে মুরাদনগর, বাঞ্ছারামপুর এবং হোমনার একটি প্রান্তিক এলাকা। কিন্তু সাধারণভাবে নিতান্ত গরিব এলাকা। একসময় এই রামকৃষ্ণপুরে বহু আলেম-ওলামা ওলী-দরবেশ এর বসবাস ছিল। এলাকাটি স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা রক্ষণশীল বলেও পরিচিত ছিল। তারপরেও কখনও উগ্র সাম্প্রদায়িকতা এখানে প্রশ্রয় পায়নি এতটুকুও। হিন্দু মুসলীম সম্প্রীতি এখানকার বিশেষ ঐতিহ্য বলেই গণ্য। ১৯২৮ সালে জুনীয়ার মাদ্রাসার স্থলে একটি হাই ইংলিশ স্কুল প্রতিষ্ঠাকালে হিন্দু-মুসলমান সবাই সমানভাবে সহযোগিতা করেছিল বলে আমাদের বড়দের কাছে শুনেছি। ১৯৪৬-৪৭ সালে ভারত বিভক্তির প্রাক্কালে সমগ্র ভারতে যেসব মর্মান্তিক সাম্প্রদায়িক উগ্রতা উপমহাদেশকে উত্তপ্ত-উত্তেজিত করেছিল তা এ অঞ্চলের মানসিকতাকে কলোষিত করতে পারেনি।
প্রশ্রয় পায়নি কোন সাম্প্রদায়িকতা। বস্তুত আমরা আমাদের শৈশব থেকে যে হিন্দু মুসলিম সৌহার্দ্য দেখে এসেছি তাই বলবৎ ছিল পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে বাংলাদেশ আমলেও। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয় কাল তথা বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরেও আমাদের এ অঞ্চলে সামান্য তম হিংস্রতাও প্রদর্শিত হয়নি কোন পক্ষ থেকে। বলতে গেলে রাজাকার মুক্ত মুক্তির সংগ্রামে এ অঞ্চলের মানুষ লড়াই করেছে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। ১৯৭২ সালের ১৬ই ডিসেম্বর। আমরা সবাই নতুন সার্ব ভৌম স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক। সবাই নতুন চেতনায় উজ্জীবিত। নতুন প্রত্যয়ে উদ্দীপ্ত। এবার যার যার সাধ্যমত দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে। আমরা হোমনা, বাঞ্ছারামপুর, মুরাদনগর এর প্রান্তিক এলাকার অধিবাসীরাও পিছিয়ে নেই। দেশের মানুয়ের কল্যান চিন্তায় আমরাও চিন্তিত। বৈঠকের পর বৈঠক চলে। একসময় সিদ্ধান্ত হয় এলাকার শহীদ মুক্তিযোদ্ধা কামাল আর তার পিতা শির মিঞা দারোগার স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য একটা কিছু করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু তা কেমন করে? প্রস্তাবের পর প্রস্তাব আসতে থাকে। কারও মতে সৌধ নির্মান, কারও মতে রাস্তার নামকরন আবার কারও মতে গ্রামের নামকরনের মাধ্যমে তাদের স্মৃতিকে ধরে রাখা যায়। কিন্তু কোনটাই স্থায়ী কল্যানকর কিছু নয়। শেষ পর্যন্ত আমি সৈয়দ মোহাম্মদ জহিরুল হক (এলাকার শেকু মৌলভী হিবাবে পরিচিত) মরহুম দবীর উদ্দীন মাষ্টার, মো: মুখলেস মাষ্টার, মোশারফ হোসেন (হবি) মোল্লা, বাবু ননী গোপাল সাহা সহ আমাদের এক বৈঠকে সাবস্ত্য করলাম, উন্নয়নমুলক কিছু করতে হলে শিক্ষার উন্নয়নই হবে সবচাইতে কল্যাণকর। আর যেহেতু আমাদের এলাকাটি সাধারনত রক্ষণশীল, তাই হাই স্কুলে সহ শিক্ষার পরিবর্তে কামালের নামে আমরা একটা বালিকা বিদ্যালয় করতে পারি তাহলেই সবচাইতে উত্তম হবে বলে মনে হল। সাব্যস্তও হল তাই।
কিন্তু আমাদের মত দরিদ্র ও রক্ষণশীণ এলাকায় কাজটি সম্পন্ন করা নিতান্তই দুষ্কর হবে নিঃসন্দেহে। হলও তাই। প্রচন্ড বিরোধিতা সত্তেও আমরা কজনা দুঃসাহসী উদ্দোগ নিয়ে এগুতে লাগলাম এবং এক সময় সফল ও হয়ে গেলাম। প্রতিষ্ঠা হলো কামাল স্মৃতি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। হোমনা থানায় সর্বপ্রথম বালিকা বিদ্যালয়। শতগুন বেড়ে গেল আমাদের সাহস ও উদ্দ্যম। ইতিমধ্যে দৌলতপুর নিবাসী আলহাজ্ব আবদুল মুমীন সাহেবের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা হয় দৌলতপুর উচ্চ বিদ্যালয় কয়েকবছর যেতে না যেতেই দেখা গেল আমাদের বালিকা বিদ্যালয়সহ আশেপাশের বিদ্যালয়গুলো থেকে এস.এস.সি. পাশের সংখ্যা যেমন বেড়ে যায় তেমনি বেড়ে যায় উচ্চ শিক্ষার উৎসাহ। এস.এস.সি. পাশের পর মেয়েদের মাঝে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার উদ্যম যেমন বেড়েছে তেমনি তাদের সংখ্যাও বেড়েছে বহুগুন। আশেপাশের বালক বিদ্যালয়ের ছেলে এবং আমাদের বালিকা বিদ্যালয়ের মেয়েদের উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার চাহিদা মেটাতে হলে একটা কলেজ করা অপরিহার্য। হোমনা থানা এলাকায় কোন কলেজ নেই।
হোমনা থানার মানিকার চর কলেজ, মুরাদনগরের শ্রীকাইল কলেজ, বি.বাড়িয়ার বাঞ্চতারামপুর কলেজ কিংবা কোম্পানীগঞ্জ কলেজে গিয়ে আমাদের এলাকার দরিদ্র ছেলে মেয়েদের পক্ষে উচ্চতর লেখা-পড়ার সুযোগ নেয়া দুঃস্বপ্ন ছাড়া কিছুই নয়। কিন্তু আমাদের বুকে তখন দুর্দান্ত সাহস। অদম্য মনোবল। আমাদের সর্বাধিক বুদ্ধিমান সহযাত্রী দবিরুদ্দীন ইতিমধ্যে আমাদের মায়া ছাড়িয়ে পরপারের যাত্রী। তারও স্বপ্ন ছিল কলেজ। বিভিন্ন উন্নয়নমুলক আলাপ-চারিতার মাঝে কোন না কোন প্রসঙ্গে কলেজের প্রসঙ্গটা এসেই যায়। এমনিভাবে কাটতে থাকে সময়। আসে ১৯৮২ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। মোশারফ হোসেন হবি মোল্লা আমাদের পক্ষ থেকে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী সাবস্ত্য হল। আমরা গতানুগতিক নির্বাচন করব না। আমাদের কিছু প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে। কথা দিয়ে কথা রাখতে হবে। আমাদের নির্বাচনী অঙ্গীকারের মধ্যে পহেলা নম্বর অঙ্গীকার হল গরীব ছেলে-মেয়েদের উচ্চ শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষে রামকৃষ্ণপুরে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করব আমরা। আমাদের প্রতিপক্ষ আমাদের এ অঙ্গীকারে প্রহসন বা আমাদের ভাওতা বাজি প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করলেন সারা ইউনিয়ন জুড়ে। আমরা নির্বাচনে পরাজিত হলাম। কিন্তু আমরা আমাদের অঙ্গীকার ভুলে গেলাম না।
বরং আমাদের উৎসাহে ভাটা পড়ল না এতটুকুও। ইতিমধ্যেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল আমাদের কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের কথা। তখন হোমনার থানা নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব আলাউদ্দীন। এলাকার কোন পরিকল্পনা উপলক্ষে তার কার্যালয়ে মুখলেস মাষ্টার, মোশারফ হোসেন হবি মোল্লাসহ আমরা কয়েকজন উপস্থিত। প্রসঙ্গক্রমে আমাদের কলেজ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আলাপ হয়, পরে তিনি বললেন, আপনারা যেকোন সময় কলেজ করতে পারবেন। আপনারা আমাকে একটা সুযোগ দিন; আমি হোমনায় একটা কলেজ করে দিয়ে যাই। বললাম আমাদের প্রতি আপনার যে অগাধ বিশ্বাস, তাতে আমরা উৎসাহিত। আপনি কলেজ করুন, আমরা আপনার পরেই চেষ্টা করব, প্রয়োজনে হোমনা কলেজ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারেও আমরা সহযোগিতা করব। ইতিমধ্যেই হোমনা কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়ে গেল। আমরা আলাউদ্দীন সাহেবের কথামত অপেক্ষা করলাম ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত। আর অপেক্ষা নয়, এবার কাজে ঝাপিয়ে পড়তে হবে। সংক্ষিপ্ত আলোচনা হল একদিন সকাল ৯/১০ টায় ডা: ভানু মোহন ভট্টাচার্যের বৈঠক খানায়। সে বৈঠকে যারা উপস্থিত হলেন তাদের সবার নাম এমুহুর্তে মনে না থাকলেও হবি মোল্লা, মোখলেস মাষ্টার, বাবু ননী গোপাল সাহা, ভানু মোহন ভট্টাচার্য এবং রেজাউল করিমের কথা মনে পড়ে এবং সম্ভবত সফিউদ্দিন ও ছিল। সব্যস্ত হল ঈদের দিন এলাকার শিক্ষিত, চাকরিজীবী, শহরের লোকেরা বাড়ি এসে সবাইকে নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সে মতে সে বছর রমযানের ঈদের দিন সন্ধ্যায় রামকৃষ্ণপুর বাজার ঘাটে মতিহার লঞ্চের ছাদে এলাকার শিক্ষিত ও গণ্যমান্য লোকদের এক সভা হল। আমি মুরাদনগন থানার চন্দনাইল ঈদগাহে ঈদের নামায পড়ে ঠিক সন্ধ্যায় এসে উপস্থিত হলাম সে সভায়। সত্যি আমি সেদিন সবার চাইতে বেশি উৎসাহিত বোধ করেছিলাম এলাকাবাসীর বিশেষ করে শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-দরিদ্র, ছোট-বড় সর্ব শ্রেণীর লোকদের স্বতস্ফূর্ত উপস্থিতি দেখে। দেখলাম কলেজের ব্যাপারে আলোচনা চলছে। পর্যালোচনা হচ্ছে এর সম্ভাব্যতা-অসম্ভাব্যতা সম্পর্কে। অনেকের কন্ঠে ছিল নৈরাশ্যের সুর। অনেকের কন্ঠে দারিদ্রকিষ্ট এলাকাবাসীর দুঃসাহসের প্রতি কটাক্ষ কেউ বললেন, কলেজ করা চাট্টিখানি কথা নয়। এটা মোল্লা-মুনশীদের কাজ নয়। কথাটা শুনা মাত্র অনেকেরই অবচেত মনের তন্দ্রীতে লাগল প্রচন্ড আঘাত। কিন্তু আমিই হয়তো আহত হলাম সবচাইতে বেশী। কারন সেদিনকার সে সমাবেশে আমিই ছিলাম রামকৃষ্ণপুর মুনশী বাড়ির ছেলে এবং মৌলভী খেতাবে পরিচিত একজন সামান্য মানুষ। অবশ্য মনে মনে যথেষ্ট পরিতৃপ্ত ছিলাম। কারন, রামকৃষ্ণপুরের মুনশী পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা মহান বুজুর্গ হযরত আহসান উল্লাহ মুনশী (রা:) এর পরিবার একদিকে
যেমন সমগ্র বাংলাদেশ বিশ্রুত মহা মনীষী মওলানা আবদুল ওয়হহাব পীরজী হুজুর, মুনশী মো: ইসহাক, মওলানা মো: ইসমাইল ও মওলানা আবদুস সামাদের মত ব্যক্তির জন্ম হয়েছিল, তেমনি সাধারন শিক্ষক ও বিশিষ্টতা অর্জন করেছিলেন জনাব শামসুদ্দীন (আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়) এতদঞ্চলের প্রথম স্নাতক।
প্রায় শতাব্দী কাল আগেই আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে এলাকাবাসীর মুখ উজ্জল করেছিলেন। তারপর এ পরিবারেই জনাব আবদুল বাকী এম.এ. এলাকার প্রথম ইঞ্জিনিয়ার জনাব ছিদ্দীকুর রহমান স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আমার একমাত্র ভাই ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দ আবদুল শাকের। এছাড়াও রয়েছেন একাধিক ইঞ্জিনিয়ার, আলেম-ওলামা, পীর-দরবেশ। এককথায় গন্ডমুর্খ কোন কালেই এ পরিবারে ছিলনা। সত্যিই এটাআমাদের তপ্তির বিষয়। কাজেই যথেষ্ট ক্ষোভের পরেও অনাবিল প্রশান্তি অনুভব করলাম অন্তরের গভীরে।
যাহোক সেদিন অনেক আলাপ আলোচনার এক পর্যায়ে হবি মোল্লা ঘোষনা করলেন Money is no problem। আমরা অবশ্যই কলেজ প্রতিষ্ঠা করব। আমি বললাম, আমরা চা খাই। প্রতিদিন এক কাপ চায়ের পয়সা বাচিয়ে রাখলেই একটা কলেজ চলতে পারে। আমাদের বাজারে দোকান ঘর রয়েছে প্রায় ৫০০ (পাঁচশত)। প্রত্যেকে এক কাপ চায়ের পয়সা দান করলে কলেজ চলা কঠিন বলে মনে হয় না। একটি কলেজ চালাবার জন্য এক কাপ চাই যথেষ্ট। কথাটা সামান্য ছিল কিন্তু এলাকাবাসী 'এক কাপ চা একটি কলেজ' কথাটিকে একটি স্লোগান হিসেবে গ্রহন করলেন এবং পরবর্তিতে শুধু এক কাপ চায়ের পয়সা থেকে আমরা দৈনিক প্রায় ৬০০ টাকা মাসে ১৮০০০/- টাকা দান পেয়েছি বাজার এলাকা থেকে। এছাড়া আমাদের যুব সমাজ এলাকাবাসীর সহযোগিতায় প্রত্যেকের বাড়ী বাড়ী গিয়ে বাঁশ, কাঠ, চাল, ডাল ইত্যাদি সংগ্রহ করেছেন। যতদিন আমরা সরকারী অনুদান পাইনি এ চায়ের পয়সা এবং এলাকাবাসীর ইত্যাদি অনুদান থেকেই শিক্ষক মহোদয়ের বেতন চালিয়েছি।
যাহোক আমি কথার ধারাবাহিকতায় আসছি। লঞ্চের সে সভার পর আমরা কলেজ প্রতিষ্ঠার লক্ষে প্রথম পুর্নাঙ্গ সম্মেলন করি ১৯৮৬ সালের জুন মাসে রামকৃষ্ণপুর কে.কে.আর.কে উচ্চ বিদ্যালয়ে। সভাপতিত্ব করেন, দৌলতপুর নিবাসী জনাব আলহাজ্ব আবদুল মুমিন। এখানেও আমরা নিরাশার দুদোল্য মানতা। এরই মধ্যে বক্তব্য রাখলেন সর্বজন শ্রদ্ধেও ব্যক্তিত্ব বড় হুজুর নামে খ্যাত জনাব মনীরুল ইসলাম এম.এ. এল.এল.বি., কাজেম আলী মাষ্টার এম.এ.। উপস্থিত সবাই যেন চাঁঙ্গা হয়ে উঠল। ইত মধ্যে আরেক কৃতি সন্তান জনাব কাজেম আলী মাষ্টারের বড় ছেলে জনাব জাহাঙ্গীর আলম পিতার পক্ষ থেকে কলেজের জন্য ২৫০০০/- টাকা দানের ঘোষনা দিলেন। এটাই ছিল কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথম দান। সন্ধ্যায় সম্মেলন শেষ হল। পরদিন এলেন, মুরাদনগর থানাধীন রাজা চাপিতলা নির্বাসী দানবীর নামে খ্যাত জনাব হাজী আবদুল হাশেম সাহেব (৭০ এর নির্বাচনে হোমনা-মুরাদনগর আসন থেকে বিজয়ী এম.এল.এ.)। সঙ্গে কোম্পানীগঞ্জ বদিউল আলম কলেজের অধ্যক্ষ মনিরুল ইসলাম। তিনিও আমাদেরকে ২৫০০০/- টাকা দান করলেন। রাতভর জনাব মুখলেস মাষ্টারের বাড়ীতে চলল কলেজ প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত নানা খুটিনাটি সমস্যা ও তা সমাধানের বিষয়। শেষ পর্যন্ত সাব্যস্ত হল চলতি সেশন থেকেই কলেজ করা হবে এবং এখন থেকেই
ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করতে হবে। পরদিন থেকেই হাই স্কুলের অফিসে বসে প্রথম ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি শুরু হয়। প্রথম ছাত্রী মুখলেস সাাহবের কন্যা মাহবুবা রহমান ও প্রথম ছাত্র জনাব আবদুল মজিদ সওদাগরের ছেলে মো: মহসীন। অবিলম্বেই গোটা এলাকায় সাড়া পড়ে গেল। আশাতীত ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি হল। নির্ধারিত সময় শিক্ষক প্রয়োজন। প্রয়োজন ঘর দরজার। কিছুই নেই। জনাব হাজী আবুল হাশেম-কে সভাপতি করে কলেজের জন্য শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হল পত্রিকায়। নির্ধারিত সময়ে নিয়োগের ব্যবস্তা হল। তাও হাশেম সাহেবের ঢাকাস্থ সেগুন বাগিচার বাড়িতে। প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হলেন এলাকার কৃতি সন্তান মৌলবী মনিরুল ইসলাম এম.এ. এল.এল.বি.। প্রভাষক হিসেবে নিযুক্ত হলেন এ. এম.এস. সেলিম রেজা, পরবর্তিতে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ জনাব আবদুল জব্বার, জনাব রৌশন মিঞা, আবু নঈম ভুঁইঞা প্রমুখ। উচ্চ বিদ্যালয়েই শুরু হল কলেজের সর্বপ্রথম পাঠদান। পরে অবশ্য কলেজের একটি ঘরও আমরা বেধেছিলাম বিদ্যালয় প্রাঙ্গনেই।
আজকে যেখানে কলেজটি অবস্থিত আমার ছেলে বেলায় সেখানে একটি আম গাছ ছিল। আমরা বলতাম আক্রা-আম গাছ। জানতাম না, আক্রা আম কাকে বলে। আজকালকার মত আক্রা ছিল না তখন। মাঠের মাঝে গোপাটের ধার ঘেষে এ আম গাছের তলায় যেমন মাঠের কৃষক-রাখালরা প্রচন্ড দাব-দাহের সময় বিশ্রাম নিয়ে প্রাণ জুড়াত, শালিকরা একদন্ড জিড়িয়ে নিত। তেমনি আমরাও নানা রকম খেলা-ধুলা করতে যেতাম সেখানে। পরে জেনেছিলাম আক্রা বলে কোন আম নেই। পাশের গ্রাম শ্রীনগরের অধিবাসী কোন এক আক্রাম উদ্দীনের পারিবারিক কবরস্থান ছিল একানে। তার কবরেই এ গাছ আর সে সুবাদেই এর নাম আক্রার আম গাছ। একসময় পাশের গোপাটে চলত গরু দৌড় প্রতিযোগিতা। অনেক সময় ঘোড় দৌড় হত। কখনও সে আম গাছের তলায় দাড়িয়ে, কখনও তার ডালে চড়ে দেখতাম সেসব তামাশা। ভাবতাম, এ জায়গাটিতে একটি খেলার মাঠ অথবা কোন বড় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হলে কতই না চমৎকার হত।
কলেজের জন্য স্থান নির্বাচন করতে হবে। কমিটি হল। সে কমিটিতে রয়েছি আমি, জনাব আবদুল ওয়াহেদ সওদাগর, জনাব আবদুল কুদ্দুস সরকার, রামনগরের সফি উদ্দীন এবং আরও দু'একজন। বিভিন্ন দিকে সবাই মিলে জায়গা দেখা দেখি চলল। আমার মনে হল ছেলে বেলার স্বপ্নের কথা। আক্রার আম গাছকে কেন্দ্র করে কোন প্রতিষ্ঠানের কথা আলাপ করলাম আবদুল ওয়াহেদ সওদাগর ও আবদুল কুদ্দুস সরকার এর সাথে। তারা সম্মত হলেন। মরহুম আক্রাম উদ্দীনের পরিবারের সাথে ওয়াহেদ সওদাগরের সাথে রয়েছে আত্মীয়তা। কাজেই অতি সহজেই তিনি বর্তমান কলেজ ভবনের জায়গাটি কলেজের জন্য দিতে রাজি করিয়ে ফেললাম মালিকদেরকে। রেজিষ্ট্রিত হয়ে গেল এটাই কলেজের নিজস্ব ভূমি। পরে সংগ্রহীত হতে থাকল প্রয়োজনীয় জায়গা। পুকুর কেটে ধানী জমিকে ঘর বাধার উপযোগী করা হল। তারপর বিদ্যালয়ের যে ঘরটি কলেজের জন্য নির্মান করা হয়েছিল সেটি স্থানান্তরিত হল কলেজের নিজস্ব ভূমিতে। এলাকার প্রত্যেকটি লোক যুব সমাজ, ছাত্র, আবাল বৃদ্ধ বনিতা প্রত্যেকে নিঃস্বার্থভাবে সহযোগীতার হাত বাড়াল। এমন কোন শ্রেণী নেই যার কম বেশি অবদান নেই এ কলেজ প্রতিষ্ঠায়, পরিচালনায় ছিল না কিন্তু কলেজের শিক্ষকবৃন্দ কলেজটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, ছাত্র সংগ্রহ থেকে শুরু করে শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য বাজারের একটি ঘরে মেসিং করে থেকে যেভাবে তারা ছাত্র জনতার সাথে মিলে মিশে কৃচ্ছতার জীবন যাপন করেও যে পরিশ্রম করে কলেজটিকে টিকিয়ে রেখেছেন তার তুলনা বিরল। প্রচার প্রচারনা ইত্যাদি কাজে এলাকার যুব সমাজও ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে আমাদেরকে সার্বক্ষনীক সহযোগিতায়, সফি উদ্দীন, সেলিম রেজাসহ তৎকালীন যুবসমাজ যেভাবে সহযোগিতা করেছেন (হয়ত অনেকের নাম এই মুহুর্তে মনে নেই) তা অকল্পনীয়।
(-অসমাপ্ত-)
সৈয়দ মোহাম্মদ জুনাইদ আনোয়ার
সাবেক সভাপতি- রামকৃষ্ণপুর ডিগ্রি কলেজ